সুন্দরী প্রকৃতিতে মৃত্যুর অলৌকিক হাতছানি! রোহিণী কেন খুনি নদী?

রোহিণী নদীর মৃত্যুলীলা এখনও অব্যাহত। সে আজও অপেক্ষা করে থাকে শিকারের। নদীতে পা রাখলেই তাকে টেনে নেবে মৃত্যুগর্ভে। নিয়ে যাবে চিরঘুমের দেশে।

পৃথিবীতে নদীমাতৃক দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। আমাদের দেশে রয়েছে বহু বিচিত্র নদী। নদীকে কেন্দ্র করেই ভারতে গড়ে উঠেছে সভ্যতা। প্রাচীনকালে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম ছিল নদীপথ। আমাদের দেশে এমন অনেক নদী আছে, যাকে কেন্দ্র করে সভ্যতা গড়ে উঠেছে আবার এমন অনেক নদী আছে যাকে কেন্দ্র করে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। সেমনই এক নদী হল ‘রোহিণী’। একে দিল্লির ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’-ও বলা হয়ে থাকে। অনেকে আবার একে ‘খুনি নদী’ ও বলে থাকেন।

খুনি নদী নামটা শুনেই গা ছমছম করে ওকে। কথিত আছে, রোহিণী নদীকে ঘিরে আছে কিছু নেগেটিভ এনার্জি। স্থানীয়দের মতে, এই নদীর কাছে গেলেই নাকি অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিস দেখা যায়। পশ্চিম দিল্লির রোহিণী এলাকাতেই রয়েছে এই নদী। যে নদীতে একবার নামলে কেউ ফেরে না।

খুনি নদীর রহস্য

রোহিণী নদী যমুনা নদীর একটি শাখা মুনাক ক্যানেল, হরিয়ানা থেকে এসে দিল্লির রোহিণী এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। সেখানেই এই নদী খুনি নদী নামে পরিচিত। রোহিণী এলাকায় অবস্থিত এই খুনি নদী খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ নয়। এই রোহিণী নদী নাকি দিল্লির সবথেকে ভয়ংকর জায়গার মধ্যে অন্যতম। এই নদীর আশপাশে ঘন জঙ্গল থাকায় তা মানুষের মনে আরও ভয়ের সঞ্চার করে। রোহিণী এলাকাটি জনবহুল হলেও অনেকের মতে দিনের বেলাতেও নাকি এই নদীর পাশ দিয়ে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়, গা কেমন যেন ভারী হয়ে যায়। এই নদী নিয়ে যত রকমের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে জানা যায়, আজ অবধি অনেক মানুষের প্রাণ নিয়েছে এই নদী। তবে তা নিছক দুর্ঘটনা না অন্য কিছু, তা জানা যায় না।

আরও পড়ুন: সাত বছর ধরে বানিয়েছিলেন তিনশো শ্রমিক, বিশ্বশ্রেষ্ঠ ধনী বিল গেটসের বাড়ির অন্দর কেমন?

রোহিণী নদীর ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এক সময় অত্যাচারী শাসকরা এই নদীকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, তাঁরা অপরাধীদের এই নদীর জলে জীবন্ত ডুবিয়ে মারতেন। আবার কখনও বা তাদের মাথা কেটে লাশ এই নদীর জলে ফেলে দিতেন। কিন্তু আসল রহস্য কিন্তু অন্যদিকে। ভারতে এমন অনেক খরস্রোতা নদী আছে যাদের অতলে পড়ে গিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু রোহিণী নদী একটু আলাদা। তাকে কোনওভাবেই খরস্রোতা বলা যায় না।

রোহিণী নদীতে কী এমন আছে, যেখানে পা দিলেই মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি হয়? কালের নিয়মে অনেক জলই বয়ে গেছে কিন্তু রোহিণী নদীর খাতে ধীরে ধীরে জল কমে এসেছে। এই নদীর জল বড় জোর হাঁটু অবধি। নদীতে চোরাবালিও নেই, জলও খুব গভীর নয়। কিন্তু তাও মানুষ এই নদীতে পা দিতে সাহস পায় না। স্থানীয়দের মতে, এই নদীতে কেউ একবার নামলে সে আর জীবিত ফেরে না।

যত সন্ধে নামতে থাকে, ততই জনমানবহীন হতে থাকে এই নদীর এলাকা। সন্ধে নামলেই নাকি কিছু পৈশাচিক শব্দ শোনা যায়, যা শুনলে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাবে। অনেক টুরিস্টও নাকি এই শব্দ শুনেছেন। এলাকার অনেক মানুষও নাকি পরীক্ষা করার জন্য নদীতে নেমেছিলেন, কিন্তু তাঁরা আর ফেরেননি। নদীর কাছে গেলেই নাকি সে মানুষকে নিজের কাছে টেনে নেয় আর ফিরতে দেয় না।

আবার অনেকের মতে, এই নদীতে নাকি অপদেবতার বাস। আর এই নদী নাকি অভিশপ্ত। আত্মা, ভূতের ডেরা এই নদী। কখনও শোনা যায় দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ, কখনও বা হাসি-কান্নার শব্দ। অনেকে এই শব্দ শুনে পালাতে গিয়ে নদীতে পড়েও গেছে, লোকে বলে, নদী তাকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। এমন অনেক কাহিনি আছে এই নদীকে ঘিরে।

অনেকে বলেন, এই নদীর পাশ দিয়ে গেলে পচা লাশের গন্ধ নাকে আসে। প্রতিদিনই নাকি কোনও না কোনও মানুষের লাশ ভেসে ওঠে নদীর জলে। বলা হয়, নদী নাকি মানুষকে নিজের দিকে আকর্ষিত করে এবং তারপর মানুষকে নিজের গর্ভে টেনে নিয়ে যায়। আবার শোনা যায়, এই নদীতে আত্মাদের বাস হওয়ার কারণে তারা নাকি মানুষকে বশ করে নদীতে ঠেলে ফেলে দেয়। রাত বাড়লেই শুনশান হয়ে যায় এই অঞ্চল। এই নদীর পাশ দিয়ে যেতেও নাকি মানুষ তখন ভয় পায়। কিছু স্থানীয় মানুষ আবার বিশ্বাস করেন, চোর-ডাকাতরা পথচলতি মানুষের কাছ থেকে লুটপাট করে তাদের এই নদীতে ফেলে দেয়, এই কারণে এখানে বেশিরভাগ দিন নদীতে মানুষের লাশ পাওয়া যায়।

এতকিছুর পরেও আরও একটি রহস্য আছে এই নদী ঘিরে। সেখানকার কিছু স্থানীয় বাচ্চাদের কথায়, দিল্লিতে যখন খুব গরম পড়ে, তখন রোহিণী এলাকার কিছু বাচ্চা আজও এই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সাঁতার কাটে, স্নান করে, কিন্তু আজ অবধি একটি বাচ্চাও সেই নদীতে ডুবে মারা যায়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, যে নদীর জল গভীর নয়, চোরাবালি নেই, বাচ্চারা স্নান করলে ডুবে যায় না, সেই নদীতে প্রতিদিনই মানুষের লাশ আসে কীভাবে? তার রহস্য আজও কেউ ভেদ করতে পারেনি।

দুর্বল হৃদয়ের মানুষের জন্য নয় এই রোহিণী নদী। যাঁরা প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি নিয়ে কাজ করতে ভালবাসেন, তাঁদের জন্য এই জায়গা সোনায় সোহাগা। তবে স্থানীয় মানুষের কথা অনুযায়ী, তাঁরা টুরিস্টদের সাবধান করে দেন, কেউ যেন একা একা এই নদী এক্সপ্লোর করতে না যান। সঙ্গে যেন কেউ থাকে। দিল্লির সবথেকে রহস্যময় স্থানের মধ্যে এই খুনি নদী সবার ওপরে স্থান করে নিয়েছে। বিজ্ঞানীরাও আজ অবধি এইসব মৃত্যুরহস্যের কিনারা করতে পারেননি, কীভাবে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায় এই নদীতে পা রাখলে, জানা যায়নি তাও। রোহিণী নদীর মৃত্যুলীলা এখনও অব্যাহত। সে আজও অপেক্ষা করে থাকে শিকারের। নদীতে পা রাখলেই তাকে টেনে নেবে মৃত্যুগর্ভে। নিয়ে যাবে চিরঘুমের দেশে।

 

More Articles