'পাগল' নাড়ালে রক্ষে নেই, 'সাঁকো' শব্দের আড়ালে লুকিয়ে কোন রহস্য

Bengali Vocabulary: 'সাঁকো' শব্দটির উৎপত্তি কোথা থেকে

Asit Das
৪ মিনিট
'পাগল' নাড়ালে রক্ষে নেই, 'সাঁকো' শব্দের আড়ালে লুকিয়ে কোন রহস্য

এবারের শব্দ সাঁকো। পাগলের সাঁকো নাড়ানোর অভ্যেস তো যাওয়ার নয়। ছেলেবেলায় বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। প্রায় সমস্ত অভিধানে সংস্কৃত সংক্রম থেকে প্রাকৃত 'সাঙ্কম' হয়ে সাঁকো আসার কথা বলা হয়েছে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালাভাষার অভিধান, সংসদ বাংলা অভিধান– সব জায়গাতেই এই ব্যুৎপত্তি দেওয়া হয়েছে। বাদ নেই ঢাকার বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান ও বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানও।

তবে সুবলচন্দ্র মিত্রর সরল বাঙ্গালা অভিধানে সাঁকো শব্দটির ব্যুৎপত্তিতে 'বাংলা প্রচলিত' বলা হয়েছে। নগেন্দনাথ বসু প্রণীত 'বিশ্বকোষ' অভিধানে শব্দটিকে 'দেশজ' বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেও নানা মুনির নানা মত।

সংক্রম শব্দটির অর্থ চলন, গমন, সঞ্চরণ। সোজা রাস্তায়, হাটে-মাঠে-বাটে, পথে-প্রান্তরে সব জায়গাতেই তো চলন, গমন বা সঞ্চরণ হতে পারে। তার জন্য নদী বা খালের এপার-ওপারে মিলন ঘটানোর আয়োজন কেন? কেন এই বন্ধনের প্রয়াস? এখানে সবাই নিরুত্তর। ডাক্তারি পরিভাষায় সংক্রমণ তো একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়া বা নিজের শরীরের এক জায়গা থেকে আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া।

সেতু শব্দটি সংস্কৃতে বহুল-ব্যবহৃত। সাঁকো-র প্রতিশব্দ হিসেবে এটাই মান্য শব্দ। রামচন্দ্রের সেতুবন্ধন বলা হয়, অসেতুসম্ভব পারস্পরিক বিদ্বেষের কথাও শোনা যায়।সুশীলকুমার দে-র বাংলা প্রবাদ বইটিতে সাঁকো নিয়ে তিনটি প্রবাদের দেখা পাচ্ছি।

১. চুলের সাঁকো ক্ষুরের ধার

(প্রয়োগদৃষ্টান্ত, 'কেশের সাঁকোয়া দিমু, ক্ষুরের ধারনি'– গোপীচন্দ্রের পাঁচালী)

২. পিরীতের কত খেলা বুঝে ওঠা ভার।

চুলের সাঁকোয় তুলে দিয়ে করায় নাগে পার। (অর্থ, অতি সংকীর্ণ ও দুর্গম)

৩. সাঁকো থেকে পড়ে, অমনি জুম্মার গোসলও করে।(অর্থ, শুক্রবারের পুণ্যস্নান)।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'উজবুক' এসেছে উজবেকিস্তান থেকে? যে ধাঁধা লুকিয়ে এই শব্দে

Bengali Vocabulary: কোথা থেকে এল 'উজবুক' শব্দটি?

এই প্রসঙ্গে 'পুলসিরাত'-এর কথা মনে পড়বে। মোহাম্মদ হারুন রশিদ সংকলিত 'বাংলাভাষায় ব্যবহৃত আরবি ফারসি উর্দু শব্দের অভিধান'-এ পুলসিরাত-এর অর্থ দেওয়া হয়েছে, "পরলোকের সাঁকোবিশেষ। মুসলমানদের বিশ্বাসমতে দোজখের ওপরে অবস্থিত বিরাজমান পুল যা চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম এবং তলোয়ারের চেয়েও ধারালো। ধার্মিক-পুণ্যবান ব্যক্তিগণ বিদ্যুদ্বেগে উক্ত পুল অতিক্রম করে বেহেস্তে প্রবেশ করবেন, আর পাপীরা খণ্ড বিখণ্ড হয়ে অগ্নিময় দোজখে পড়ে যাবে। [ফারসি পুল+ আরবি সিরাত]।" এই পুলসিরাত পার হওয়া হিন্দু ভক্তদের বৈতরণী পার হওয়ার মতো ব্যাপার।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রবাদের সাঁকো চুলের মতো সংকীর্ণ, দুর্গম। ওপারে যাওয়া খুব শক্ত কাজ। কিন্তু কেউ কেউ তা টপকাতে পারে নিজস্ব মুনশিয়ানায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমগ্র সাহিত্যে মোট কুড়িবার 'সাঁকো' শব্দটি লিখেছেন। 'নষ্টনীড়' উপন্যাসে আছে,

অমল কহিল, 'আর একটা ছোটোখাটো ঝিলের মতো করতে হবে, তাতে হাঁস চরবে।'

চারু সে প্রস্তাবে উৎসাহিত হইয়া কহিল, 'আর তাতে নীল পদ্ম দেব, আমার অনেকদিন থেকে নীল পদ্ম দেখার সাধ আছে।'

অমল কহিল, 'সেই ঝিলের উপর একটি সাঁকো বেঁধে দেওয়া যাবে, আর ঘাটে একটি বেশ ছোটো ডিঙি থাকবে।

'য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারী'-তে তিনি ফ্রান্স-ভ্রমণের বিবরণ দিয়েছেন,

চঞ্চলা নির্ঝরিণী বেঁকেচুরে ফেনিয়ে ফুলে নেচে কলরব করে পাথরগুলোকে সর্বাঙ্গ দিয়ে ঠেলে রেলগাড়ির সঙ্গে সমান দৌড় দিয়েছে। মাঝে মাঝে এক একটা লোহার সাঁকো-মুষ্টি দিয়ে তার ক্ষীণ কটিদেশ পরিমাপ করার চেষ্টা করছে।...

'জানা-অজানা' কবিতায় লিখেছেন-

চোখ-বোজা অভ্যাসের পথ দিয়ে যাই।

দেখি যাহা অনেকটা স্পষ্ট দেখি নাকো।

জানা-অজানার মাঝে সরু এক চৈতন্যের সাঁকো,

ক্ষণে ক্ষণে অন্যমনা

তারি 'পরে চলে আনাগোনা।

সাঁকো যে চৈতন্যেরও হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কে জানাবেন আমাদের! তিনি জোড়াসাঁকোর সুসন্তান তো বটেই, তামাম বিশ্বেরও তিনি বরেণ্য সন্তান। মহাবিশ্বে চলে তাঁর চৈতন্যের আনাগোনা।

এখন দেখতে হবে, সাঁকো শব্দটির প্রচলিত ব্যুৎপত্তি 'সংক্রম> সাঙ্কম> সাঁকো' ছাড়াও অন্য কোনও ব্যুৎপত্তি সম্ভব কি না। সুবলচন্দ্র মিত্রর 'আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান'-এ (প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ১৯২৬ সালে) কিন্তু সাঁকো শব্দটি নেই। 'সাকম্' বলে যে শব্দটি এখানে পেলাম, তার অর্থ - সহ, সঙ্গে। ব্যুৎপত্তি,– [ সহ শব্দ–অক(গমন করা)+ অম্ ক]। এই সাকম থেকে সাঁকো এসেছে কিনা ভেবে দেখা যায়।

কারণ নদীর দু'টি পার একসঙ্গে পথ চলা শুরু করে এই সাঁকো-র মাধ্যমে। সাঁকোই একপারকে অন্যপারের সহযোগী করে তোলে। সাকম্ > সাকো > সাঁকো, এই পথেও সাঁকো শব্দটি আসতে পারে। আবার, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর অভিধানে 'সাঁকাল' বলে যে শব্দটি দিয়েছেন, সেটিও ভাবায়। সাঁকাল [শৃঙ্খল > ] বি, দড়ির শিকল।

শৃঙ্খল মানেই তো বন্ধন। নদী বা খালের একপারের সঙ্গে অন্য পারের বন্ধন তৈরি করে সাঁকো। বলা চলে, দুই পারকে শৃঙ্খলিত করে এই সাঁকো। তাই সাঁকাল বা দড়ির শিকলকে বলা চলে প্রিমিটিভ সাঁকো। সাঁকাল যদি শৃঙ্খল শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়, তবে সাঁকাল থেকে সাঁকা হয়ে তা থেকে সাঁকো আসতেই পারে। এই আসাটা সংক্রম থেকে সাঙ্কম হয়ে সাঁকো আসার চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে। কেননা, সংক্রমে নদীর দুই পারকে মেলানোর প্রয়াস নেই, আছে শুধু চলা, সঞ্চারিত হওয়া।

সাকম্ থেকেই আসুক বা সাঁকাল থেকে আসুক, সাঁকো কিন্তু সংক্রম থেকে এসেছে বলেই অভিধানকারদের প্রচলিত বিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে দূরীভূত করার ক্ষমতা আমাদের মতো কলাম-লেখকদের নেই।

সাঁকো নিয়ে এক ঐতিহাসিক নামকরণের কথা বলা যাক। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র অন্যতম প্রাণপুরুষ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম আরবি শব্দ 'জসর' থেকে অধুনা বাংলাদেশের যশোর শহরের নাম এসেছে বলে ভেবেছিলেন। কারণ আরবি ভাষায় জসর মানে সেতু। ওই নদীমাতৃক জনপদটিতে অসংখ্য সাঁকো দেখেছিলেন তিনি। তাই জসর বা যশোর তথা যশহর নাম হয়েছিল জায়গাটির, এটাই তিনি ভেবেছিলেন। সাঁকো তাহলে আমাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে শৃঙ্খল রচনা করছে।

শেষে একটি কথা না বললেই নয়। মুহম্মদ ফজলুর রহমানের আরবি-বাংলা অভিধানে 'শাক' শব্দের অর্থ নল বা গাছের শাখা। দু'টি জিনিসই কিন্তু সাঁকো তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই আরবি শাক থেকে সাঁকো বা গলার সাঁকি আসছে কি না, ভেবে দেখতে হবে।

শব্দের উৎস নিয়ে ভাবতে বসে কোনও ভাষাকেই ব্রাত্য করে রাখা যায় না। তলিয়ে দেখা দরকার।

লিখেছেন
Asit Das
Asit Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।