লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া, এক পা হারিয়েও জীবনযুদ্ধ থামেনি কাশ্মীরি বালকের

Sayan Das
৪ মিনিট
লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া, এক পা হারিয়েও জীবনযুদ্ধ থামেনি কাশ্মীরি বালকের

সত্যি বলতে গেলে, মানসিক জেদ এবং কোনও কাজের প্রতি দৃঢ় নিষ্ঠা থাকলে সবরকম বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হয় মানুষ। এক বালকের জীবনকাহিনি যেন তেমনই বার্তা দিচ্ছে। জীবনযুদ্ধে হার মানা যে উচিত নয়, নিজের জীবনের প্রতিটি পদে সেই কথাটি যেন প্রমাণ করে চলেছে জম্মু ও কাশ্মীরের হান্দওয়ারারের এক প্রতিবন্ধী বালক।

নাম, পারভেজ আহমেদ। জম্মু ও কাশ্মীরের হান্দওয়ারার বাসিন্দা তিনি। ছোটবেলায় এক ভয়ংকর দুর্ঘটনায় পা হারান পারভেজ। তবে সেই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দমে থাকে না ছোট বালকটি। ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে সাফল্যের পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংগ্রাম চালায় সে। কেবল প্রতিবন্ধী বলে জীবন কি আটকে থাকবে? একদমই নয়, বর্তমানে সকল প্রতিবন্ধকতাকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে পড়াশোনা করে চলেছে সে।

জানা গিয়েছে, বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয় হলেও প্রতিদিন সেই রাস্তা অতিক্রম করে নিজের লক্ষ্যের পথে এগিয়ে চলে পারভেজ। সেই পথে একাধিক বাধা এলেও তা পেরিয়ে নতুন আলোর সন্ধানে এগিয়ে চলে সে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এই জীবনযুদ্ধের কাহিনি উঠে আসায় মুগ্ধ হয়ে পড়েছে নেটিজেনরা। কীভাবে এক বালক কেবলমাত্র জেদের বশেই একের পর এক বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে, তা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না দেশবাসীর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চোরাশিকারিদের ত্রাস, বন্যপ্রাণীদের বুকে আগলে রাখেন এই মানুষটা

পিরা রাম রয়্যাল ব্যাঙ্ক অফ স্কটল্যান্ডের তরফ থেকে 'Earth Heroes Award' সম্মানে ভূষিত হন। এই পুরস্কার তাঁরাই পান, যাঁরা পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে বিশেষ ছাপ রাখেন, যাঁরা পরিবেশকে বাঁচাতে নিরলস পরিশ্রম করেন।

পারভেজকে তার সংগ্রামের কাহিনি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় সে বলে, "আমরা যে এলাকায় থাকি, সেখানকার রাস্তা খুব একটা ভালো নয়। ছোট থেকেই দেখে আসছি রাস্তা খারাপ। তবে আমাকে যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়, তবে বিদ্যালয়ে পৌঁছতেই হবে। সেই কারণে এক পায়ে ভর দিয়ে কোনওমতে পৌঁছে যাই স্কুলে। তবে সত্যি বলতে গেলে, এতে অসুবিধেও হয় অনেক। সেই কারণে যদি একটি কৃত্রিম অঙ্গ পাওয়া যেত, তাহলে স্কুল যাওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য একাধিক কাজ করতেও সুবিধে হতো।" সাক্ষাৎকারজুড়ে পারভেজের করুণ আর্তি ছড়িয়ে পড়ে সকলের কাছে। বর্তমানে তার এই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরেই সকলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেয় ছোট পারভেজকে এবং এরপরেই বালকটির সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন জয়পুর ফুট ইউএসএ-র প্রধান প্রেম ভান্ডারি।

তবে শুধু স্কুল যাওয়াই নয়, বাড়ির ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে অন্যান্য বিভিন্ন কাজে হাত লাগিয়ে চলে পারভেজ। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা যেন তার সামনে কোনও বাধা বলে বিবেচিতই হয় না। তার এই অদম্য লড়াই দেখে বিনামূল্যে তাকে কৃত্রিম অঙ্গ প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জয়পুর ফুট ইউএসএ-র প্রধান প্রেম ভান্ডারি। এই সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, "সম্প্রতি পারভেজ আহমেদের জীবনযুদ্ধের কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছে সোশ‍্যাল মিডিয়াজুড়ে। এরপরেই আমি এবং আমার পরিবার আবেগঘন হয়ে পড়ি। পরবর্তীতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ওই বালকটিকে আমাদের কোনও না কোনওভাবে সাহায্য করতেই হবে। সেই কারণে আমরা ওর বাবা-মার সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং খুব দ্রুত ওকে বিনামূল্যে কৃত্রিম অঙ্গ দান করা হবে। আশা করা যায় যে, এরপর পারভেজের সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে।"

উল্লেখ্য, বর্তমানে পারভেজ জম্মু ও কাশ্মীরের নওগাঁয় একটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে পারভেজ। নবম শ্রেণির এই বালকের লক্ষ্য ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়া এবং পিছিয়ে পড়া মানুষকে সাহায্যর মাধ্যমে সমাজে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করা। পারভেজের এই অপরাজেয় মনোভাব প্রসঙ্গে তার এক স্কুলশিক্ষক জানান, "পারভেজ ছেলে হিসেবে খুব ভালো। ও প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। তবে শুধুমাত্র বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাই নয়, অন্যান্য একাধিক ক্ষেত্রেও যোগদান করে ও। দেখে কেউ বলতেই পারবে না যে, কত বড় সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে পারভেজ। তাই আমরা চাই ভবিষ্যতে ও আরও এগিয়ে চলুক।"

তবে পারভেজের এই জীবনযুদ্ধকে একদম সামনে থেকে যাঁরা দেখে চলেছেন, তাঁরা হলেন পারভেজের বাবা ও মা। ছোট থেকেই ছেলের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে চলেছে তাঁর গোটা পরিবার। এক্ষেত্রে পারভেজের বাবা গোলাম আহমেদকে ধরা হলে আবেগঘন দেখায় তাঁর গলা। তিনি বলেন, "পারভেজ যখন খুব ছোট ছিল, তখন এক ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড হয়, আর সেই ঘটনায় ও নিজের পা হারায়। প্রথমে স্বভাবতই আমরা প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলাম। আমার স্ত্রী বর্তমানে হার্টের রোগী। এছাড়া পারভেজের সঙ্গে যখন ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে, সেই মুহূর্তে আমি বাড়িতে উপস্থিত ছিলাম না। দুর্ভাগ্যবশত তাই আমি ছেলেকে উদ্ধার করতেও অক্ষম হই। তবে ভগবানের করুণায় সেই যাত্রায় বেঁচে যায় ও।"

পারভেজের বাবা আরও বলেন, "সেই অগ্নিকাণ্ডের পর পারভেজের অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে তিন লক্ষ টাকা দাবি করে বসে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কাছে এত টাকা ছিল না। তবে আমরা কেউ হার মানিনি। ছেলেকে সুস্থ করে তোলাই ছিল সেই মুহূর্তে আমার একমাত্র দায়িত্ব আর সেই কারণে সব চিন্তা ভুলে সমস্ত সম্পত্তি আমি বিক্রি করে দিই। সেই টাকায় সুস্থ করে তোলা হয় ছেলেকে। কিন্তু বর্তমানে পারভেজ অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলেছে। প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাকে স্কুল যেতে হয়। তাই আমি সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ করতে চাই যে, আপনারা আমার ছেলেকে সহায়তা করুন যাতে ও কিছুটা হলেও বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতির হাত থেকে স্বস্তি পায়। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, বিভিন্ন খেলাধুলোর প্রতিও ঝোঁক রয়েছে পারভেজের। তাই আমি চাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও এগিয়ে চলুক।"

লিখেছেন
Sayan Das
Sayan Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।