হু হু করে বাড়ছে সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম, শিশুকে নিরাপদ রাখতে এই নিয়ম মানতেই হবে

দেশ-বিদেশে বহু শিশুর এভাবে মৃত্যু হয়েছে। তবে এই অসুখের কারণ আজও রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।

Piya Saha
৩ মিনিট
হু হু করে বাড়ছে সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম, শিশুকে নিরাপদ রাখতে এই নিয়ম মানতেই হবে

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি হলেও কিছু রোগের ব্যাপারে চিকিৎসাশাস্ত্র আজও দিশা দেখাতে পারেনি। তেমনই একটা সমস্যা হল সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম ( SIDS)। এর অর্থ, এক বছরের কমবয়সি শিশুর হঠাৎই ঘুমের মধ্যে মৃত্যু। আবার অনেক সময় দেখা যায়, জন্মানোর কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা যায় দুধের শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা না করালে অনেক সময় তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত হয় এই রোগে। দেশ-বিদেশে বহু শিশুর এভাবে মৃত্যু হয়েছে। তবে এই অসুখের কারণ আজও রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানীর মতে, সাধারণত রক্তে বুটিরিলকোলিনেস্টেরাস (BChE) নামে এক ধরনের উৎসেচক কমমাত্রায় থাকার কারণেই শিশুদের রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। এই অসুখ 'কোট ডেথ' নামেও পরিচিত। পশ্চিমের দেশগুলোতে কয়েকহাজার শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এসআইডিএস। এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন' জানিয়েছে যে, প্রত্যেক বছর অজানা কারণে প্রায় ৩,৪০০ জন শিশু আচমকাই মারা যায়। অপর দিকে, ব্রিটেন জানিয়েছে যে, বছরে প্রায় ২০০ জন শিশুর প্রাণ যায় এমন অজানা কারণে। অস্ট্রেলিয়ায় এই রোগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণা অনেক দূর এগোলেও এসআইডিএসের নির্দিষ্ট সঠিক কারণ এখনও অজানাই রয়ে গেছে।

সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম (এসআইডিএস) কী?

সাধারণত ঘুমের সময় এক বছরের কম বয়সি কোনও সুস্থ শিশুর আচমকা মৃত্যুকেই সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিমড্রোম বলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১ থেকে ৪ মাস বয়সের মধ্যে শিশুদের এসআইডিএসের কারণে মৃত্যু হতে দেখা গিয়েছে।

অনেক চিকিৎসক মনে করেন যে, শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ ও জেগে থাকা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে অংশ দায়ী তার কোনও সমস্যা হলে এসআইডিএসে মৃত্যু হতে পারে শিশুর। শীতের দেশে এই কারণে মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই বেশি। আমাদের দেশে শীতকালে এই সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।তাই এই সময় গর্ভবতী মা এবং সদ্য মায়েদের সাবধান হওয়া প্রয়োজন।

মৃত্যুর কারণগুলি কী কী?

এখনও পর্যন্ত মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও যে যে-ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেড়ে যায় সেগুলি হল:

১. যেসব শিশু জন্মানোর সময় কম ওজন নিয়ে জন্মায়, তাঁদের ঝুঁকি স্বাভাবিক ওজনের অধিকারী শিশুদের তুলনায় বেশি হয়।

২. গর্ভাবতী অবস্থায় ধূমপান চালিয়ে গেলে বা হবু মায়ের সামনে যদি বাবা অথবা অন্যরা সিগারেট-বিড়ি খান, তাঁদের শিশুদের এসআইডিএসের ঝুঁকি অনেক বেশি।

৩. নির্দিষ্ট সময়ের আগে শিশুর জন্ম হলে, অর্থাৎ প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আচমকা হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঘাতক হৃদরোগ প্রাণ নিল কে কে-র, কীভাবে আগেভাগে আপনি চিনবেন আসন্ন বিপদকে?

কে কে-র পোস্টমর্টেমের কারণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে 'মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন'।

৪. দেখা গেছে, শিশু হিসেবে ছেলেদের ঝুঁকি মেয়েদের তুলনায় বেশি।

৫. ২০ বছরের থেকে কম বয়সে সন্তানের জন্ম দিলেও ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম’-এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

৬. গবেষণায় দেখা গেছে একটি শিশুর যদি এমন আচমকা মৃত্যু হয়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী সন্তানের মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় দশ গুণ বেশি হয়।

৭. বাচ্চাদের উপুড় করে ঘুম পাড়ালেও অনেক সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই সবসময় চেষ্টা করুন, বাচ্চাকে নিচের দিকে পিঠ রেখে শোয়াতে।

৮. বাচ্চার গায়ে কম্বল বা অন্য ভারী কিছু চাপা দিয়ে রাখলেও মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে।

৯. পাহাড়ি অঞ্চলে অথবা খুব বেশি ঠান্ডার সময় শিশুর ঘরে রুম হিটার বা কাঠ-কয়লা জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখার চেষ্টা করলে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। যার থেকে আচমকা মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

১০. অত্যন্ত নরম বিছানায় ঘুম পাড়ালেও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

গবেষণা কী বলছে ?

ই-বায়ো মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসআইডিএসে যে-সকল শিশুর মৃত্যু হয়, তারা অন্য শিশুদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন ধরনের হয়।এক্ষেত্রে গবেষকরা ৬৫৫ জন সুস্থ শিশু, এসআইডিএসের কারণে মৃত ২৬ জন শিশু এবং অন্য কোনও কারণে মৃত্যু হওয়া ৪১টি শিশুর শুকনো রক্তের মধ্যে তুলনা করে দেখেন। গবেষণায় দেখা যায় যে, এসআইডিএসের কারণে মৃত দশটি শিশুর মধ্যে নয় জনের বিসিএইচই উৎসেচকের মাত্রা অন্য দু'টি বিভাগের শিশুদের তুলনায় কম রয়েছে। এই বিসিএইচই উৎসেচক শিশুর জেগে থাকা, মাথা ঘোরানো এবং শ্বাস নেওয়ার জন্য সংকেত পাঠায়। শিশুর শরীরের রক্তচাপ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো শারীরিক কাজগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে এই উৎসেচক বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেননি তাঁরা। তাই ভবিষ্যতেও এই অসুখের চিকিৎসা কীভাবে করা হবে, এখন সেটাই দেখার।

করণীয়

কিছু কথা মাথায় রাখলে শিশুমৃত্যু খানিকটা হলেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

১. বাচ্চাকে উপুড় করিয়ে ঘুম পাড়াবেন না। চেষ্টা করুন, সোজা করে শুইয়ে রাখার।

২. আশেপাশের কেউ ধূমপান করলে গর্ভাবস্থায় বা ছোট দুধের শিশুকে তাঁর থেকে সেই সময় দূরে রাখুন।

৩. ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাতে ফুলহাতা জামা-প্যান্ট পরিয়ে রাখুন। মোটা কম্বল ব্যবহার না করাই ভালো।

৪. সদ্যোজাত শিশুকে পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করুন।

৫. কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার পদ্ধতি সব মা-বাবাদের জেনে রাখা ভালো। কোনও সমস্যা হলে দ্রুত কাছাকাছি চিকিৎসকের পরমার্শ নিন। কোলের সন্তানকে নিয়ে সুস্থ থাকুন।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।