নেহরু থেকে ইন্দিরা, ডায়েটে যায় নেতা চেনা

Nehru Indira Diet Chart: পঞ্চগনি থেকে ফিরে আবার মাংস ধরেছিলেন ইন্দিরা ফিরোজ গান্ধীর পাল্লায় পড়ে। ফিরোজ তখন বন্ধু।

Sindhu Som
৪ মিনিট
নেহরু থেকে ইন্দিরা, ডায়েটে যায় নেতা চেনা

মিশেল ওবামাই সম্ভত প্রথম, যিনি হোয়াইট হাউসে সবজি চাষ শুরু করেন, রীতিমতো এলাহি ছিল আয়োজন। সে বাগান থেকে হোয়াইট হাউসের সমস্ত কিচেনে সবজি যেত। এছাড়া এই সবজি গৃহহীন মানুষদের একটি শেলটারের যাবতীয় প্রয়োজন মেটাত। এ নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি, কিন্তু তাতেও মহিলা পিছপা হননি। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাস, খাদ্যরুচি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। যদিও ভারতের ক্ষেত্রে নেতা-নেত্রীদের খাদ্যাভ্যাস এখন আর খুব একটা চর্চার বিষয় নয়, তাদের খাদ্যতালিকা প্রকাশ্যে এলেও তা কতটা ‘সাধারণ’ হবে, বা আমজনতার সাধ্যের মধ্যে হবে–তা সন্দেহের বিষয়।

গান্ধী নিজের ঘনিষ্ঠদের অবিরাম তাঁর নিজের খাদ্যাভ্যাস মেনে চলার নানান উপদেশ দিতেন। বল্লভভাই প্যাটেল হোক বা জি ডি বিড়লা, এই সমস্ত স্বাস্থ্যবিধির উপদেশ প্রায় সারাক্ষণই শুনতে হত তাদের। কিন্তু নেহরুকে এ ধরনের উপদেশ কখনও দেননি গান্ধী। কেন? অনেকে মনে করেন রাজনৈতিক ভাবে একে অন্যের অত্যন্ত প্রিয় হলেও, গান্ধীর ব্যক্তিগত পরিসরে নেহরু তেমন জায়গা করতে পারেননি কোনওদিন।

কাশ্মীরিদের মাংসপ্রীতি ভুলে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসে নেহরু কখনই আসতে পারতেন না। এই ব্যাপারে ইন্দিরা ছিলেন বাবার অনুগামী। ১৯৫৬ সালে ইস্যু হওয়া একটি সরকারি নথি বলছে, “প্রধানমন্ত্রী (নেহরু) ঝাল মশলা একেবারেই খেতে পারেন না। মাংস খান, তবে শাক-সব্জি খেতে পছন্দ করেন প্রচুর। ...সাধারণত সকালে গরম দুধ দিয়ে কফি, আর বিকেলে চা খেয়ে থাকেন।” সত্যিই নেহরু তেল ঝাল মশলা খুব একটা খেতে পারতেন না। সকালে ইংলিশ নাস্তা থাকত রোজই। তবে নেহরুর যা সব থেকে প্রিয় তা ছিল তন্দুরি চিকেন। তন্দুরি চিকেন আদতে পঞ্জাবি খানা। মাটির উনুনে মুরগির মাংসে মশলা মাখিয়ে সম্পূর্ণ সেঁকে ফেলা হয়। শোনা যায় এই মাটির উনুনে পাখির মাংস সেঁকে খাওয়ার প্রমাণ মিলেছে হরপ্পার ধ্বংসাবশেষেও। সুশ্রুত সংহিতাতেও এই ধরনের খাবারের উল্লেখ রয়েছে।

৪০-এর দশকের শেষের দিকে কুন্দন লাল জগ্‌গি, ঠাকুর দাস এবং কুন্দন লাল গুজরল—এই ত্রিমূর্তি পেশোয়ারে ‘মোতি মহল’ নামে একটি রেস্তোরাঁ খুলে তন্দুরি চিকেনকে জনপ্রিয় করে তোলেন। দেশভাগের পর ‘মোতি মহল’ চলে আসে দিল্লির দরিয়াগঞ্জে। দরিয়াগঞ্জের এই রেস্তোরাঁর তন্দুরি চিকেন নেহরুর এতই পছন্দ ছিল যে তিনি সরকারি ভোজের মেনুতে একে পাকাপোক্ত করে ফেলেন। ‘মোতি মহলের’ আরও নামডাক যাতে হয়, তাই ব্যবসার উন্নতির জন্য নেহরু তাদের থেকে খাস প্লট ভেটও দিয়েছিলেন। শুধু নেহরু নন, নিকিতা ক্রুশচেভ এবং জুলফিকার আলি ভুট্টোর এ খানা এতটাই পছন্দ ছিল, যে ক্রুশচেভ নাকি মস্কৌ নিয়ে গিয়েছিলেন তন্দুরি চিকেন। এটি ছাড়া রোগন জুসও বেশ পছন্দ করতেন নেহরু।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উৎসবের আলোর ভিড়ে বঞ্চনার অন্ধকারে ডুবে রইলেন ডেলিভারি শ্রমিকরা

Durgapuja 2022: কেমন কাটল ডেলিভারি শ্রমিকদের দুর্গাপুজো? খোঁজ নিল ইনস্ক্রিপ্ট।

ইন্দিরার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ খুব কমই জানা যায়। সেটা তিনি ব্যক্তিগত বিষয়ের ব্যাপারে একটু সাবধানী ছিলেন বলেও হতে পারে, অথবা এও সম্ভব, লেখকেরা তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হতেন যে কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন– তা তাদের খুব একটা খেয়াল থাকত না। তবে বাবার সঙ্গে চিঠি চালাচালির ক্ষেত্র ছিল ইন্দিরার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। সেখানে তেমন রাখঢাক থাকত না কিছুই। পুত্রবধূর সম্পাদনায় সেইসব মণিমানিক্য একসঙ্গে ছেপে বেরিয়েছে। সেখানে তাঁর খাবারের কিছু কিছু ঝলক পাওয়া যায়। ১৯৩২ সালে ইন্দিরা লিখছেন, “খাবারের মধ্যে সেই শাক-সবজি, মাছ, ডিম এসবই। তবে স্যলাডটা অত্যন্ত ভালো। প্রতিদিন এত টাটকা পাতাটাতা পাওয়া যায় যে আমরা একটু বেশি বেশি করেই খেয়ে ফেলি সেসব।” তখন ইন্দিরা পড়ছেন পঞ্চগনিতে, নেহরুর এক বন্ধুর স্কুলে। গান্ধী তখন কাছেই। পুনের জেলবন্দি। নেহরু প্রায়ই মেয়েকে গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে বলতেন। যেতেনও ইন্দিরা। বিশেষত যেবার গান্ধী আম্বেদকরকে শোষিত বর্ণের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী গঠনের সিদ্ধান্ত বদলে সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীর মধ্যেই সংরক্ষণে রাজি করালেন, সেবার ইন্দিরাই গান্ধীর সেই অনশন ভাঙিয়েছিলেন। নিজের হাতে কমলার রস করে খাইয়েছিলেন গান্ধীকে।

মাংস খাওয়া নিয়েও বাবা-মেয়ের গল্প হত চিঠিতে। পঞ্চগনি থেকে ফিরে আবার মাংস ধরেছিলেন ইন্দিরা ফিরোজ গান্ধীর পাল্লায় পড়ে। ফিরোজ তখন বন্ধু। বন্ধু তাঁকে ঢের ঢের বেশি খাবার খাইয়ে দিচ্ছে– এমনটাও লিখেছেন ইন্দিরা। নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার থেকে ফিরে নেহরু লিখছেন মেয়েকে আফ্রিদি ট্রাইবের কাছে ভেড়ার রোস্ট খাওয়ার কথা। অমন তৃপ্তি করে নাকি জীবনে খুব কমই খেয়েছেন তিনি। সে এক অপূর্ব রসনার রসায়ন।

একটা মজার গল্প বলে শেষ করি। ইকোনমিক টাইমসের স্পেশাল ফিচারের সম্পাদক বিক্রম ডক্টর লিখেছেন তাঁর এক বন্ধুর অভিজ্ঞতার কথা। সে বন্ধু তখন এয়ার ইণ্ডিয়ার এয়ার স্ট্যুয়ার্ড। প্রধানমন্ত্রী সে সময় সাধারণ বিমানেই যাতায়াত করতেন। ইন্দিরার জন্য ফার্স্ট ক্লাস তো ছিলই না, সাধারণ আটটি সিট বুক করা থাকত মাত্র। স্মোকড্‌ স্যামন মাছের স্যান্ডুইচ অত্যন্ত পছন্দ করতেন ইন্দিরা, সেবারও সঙ্গে কিছু নিয়ে উঠেছিলেন। বন্ধুটি তা জানত। কিন্তু বিমানে খাবার দেওয়ার সময় ইন্দিরা গিয়েছিলেন ঘুমিয়ে। তাতে বন্ধুটির ধারণা হয় ইন্দিরা নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত নন। এদিকে ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছে প্রচণ্ড। তার ওপর স্মোকড্‌ স্যামন স্যান্ডুইচ। সামলানো যায়? ইন্দিরার খিদে না থাকা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে সবকটি স্যান্ডুইচই খেয়ে ফেলেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরকীয়া থেকে ত্রিকোণ! হরিদেবপুর কাণ্ড মনে করাচ্ছে প্রেমের জন্য হত্যার কালো অতীত

Haridevpur murder case: কলকাতার হরিদেবপুর হত্যাকাণ্ড মনে করাচ্ছে প্রেমের জন্য হত‍্যার ইতিহাস।

এদিকে ঘুম ভেঙে উঠেই ইন্দিরা খোঁজ করলেন সেই স্যান্ডুইচের। ছেলেটির সুপারভাইজারের তো এখন যান তখন যান অবস্থা। তিনি তখন সেই বন্ধুটিকে ডেকে বললেন, “অপরাধ স্বীকার করে শিগ্‌গির ক্ষমা চেয়ে আসো। কেলেঙ্কারি করেছ তো।” ছেলেটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে জানায়, “ম্যাডাম, আপনি স্মোকড্‌ স্যামন স্যান্ডুইচ চেয়েছেন বটে, কিন্তু সে তো নেই, ফুরিয়ে গিয়েছে।” ইন্দিরা অবাক হয়ে বলেন, “একটাও নেই?” ছেলেটি খুবই জড়তার সঙ্গে জানায়, “না ম্যাডাম। আমি খেয়ে ফেলেছি।” বলার ভঙ্গিতে আর সারল্যে ইন্দিরা হেসে ফেলেন। বলেন, “যাক। ভালো লেগেছে আশা করি।” ব্যাপারটা আর বেশিদূর এগোয়নি।

তথ্যঋণ-

Doctor, Vikram. n.d. “Indira Gandhi Liked Her Meal Straight & Simple.” The Economic Times. Accessed December 15, 2021.

D’Souza, Flexcia. n.d. “The History of Tandoori Chicken: Infographics.” The Times of India. Accessed December 15, 2021.

“Food for Thought.” n.d. Accessed December 15, 2021

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।